সাব্বির হোসেন: নারায়ণগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম এলাকা ২নং রেলগেটের পাশে অবস্থিত একটি ছোট্ট পার্ক। একসময় যেখানে নগরবাসী একটু নিরিবিলি পরিবেশে বসে বিশ্রাম নিতেন, গল্প করতেন কিংবা ক্লান্তি দূর করতেন সেই পার্ক এখন যেন পরিণত হয়েছে অস্থায়ী খাবারের হোটেলে। পার্কজুড়ে বসেছে অসংখ্য খাবারের দোকান। হকারদের দখলে হারিয়ে যাচ্ছে পার্কটির মূল উদ্দেশ্য ও সৌন্দর্য।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী নগরবাসীর স্বস্তি ও বিনোদনের কথা চিন্তা করে ২নং রেলগেট এলাকায় এই পার্কটি নির্মাণ করেছিলেন। ব্যস্ত নগর জীবনে মানুষের জন্য একটু বিশ্রামের জায়গা করে দিতে এবং পথচারীদের বসার সুবিধার্থে এই পার্কটি গড়ে তোলা হয়। প্রথমদিকে পার্কটি ছিল বেশ পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন। বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে বসে সময় কাটাতেন। কেউ কাজের ফাঁকে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পার্কটির পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করে বলে স্থানীয়রা জানান। ধীরে ধীরে হকাররা পার্কের চারপাশে দোকান বসাতে শুরু করেন। প্রথমে কয়েকটি অস্থায়ী দোকান থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দোকানের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো পার্ক এলাকা প্রায় দখলে নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন হকাররা।
৭ মার্চ শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পার্কটির চারপাশ ঘিরে বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান বসানো হয়েছে। চটপটি, ফুচকা, ঝালমুড়ি, ভাজাপোড়া, চা, শরবতসহ নানা ধরনের খাবার বিক্রি করছেন দোকানিরা। দোকানের সামনে রাখা হয়েছে প্লাস্টিকের চেয়ার ও টেবিল। ক্রেতারা সেখানে বসেই খাবার খাচ্ছেন। ফলে পার্কটি এখন অনেকটা খোলা আকাশের নিচে তৈরি খাবারের হোটেলের মতো রূপ নিয়েছে।
পার্কের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে রান্নার চুলা, খাবারের স্টল এবং প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী। অনেক দোকানির সামনে রাখা আছে বড় বড় হাঁড়ি-পাতিল। খাবার তৈরির সময় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে পুরো এলাকায়। এছাড়া খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিকের কাপ-প্লেট ও ময়লা-আবর্জনায় নোংরা হয়ে যাচ্ছে পার্কের পরিবেশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের অনুমতি বা নিয়মনীতি না মেনেই এসব দোকান বসানো হয়েছে। দিনের পর দিন নির্বিঘেœ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন হকাররা। অথচ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, এই পার্কটা আগে খুব সুন্দর ছিল। আমরা প্রায়ই এসে বসতাম। এখন পুরো জায়গাটা দোকানে ভরে গেছে। বসার জায়গা তো নেইই, উল্টো চারপাশে ধোঁয়া আর ময়লার কারণে পরিবেশটাই খারাপ হয়ে গেছে।
আরেকজন পথচারী বলেন, পার্কের উদ্দেশ্য ছিল মানুষ একটু বিশ্রাম নেবে। কিন্তু এখন মনে হয় যেন রাস্তার পাশে বড় কোনো খাবারের বাজার বসেছে। এতে পার্কের সৌন্দর্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ আবার ভিন্ন মতও দিয়েছেন। তাদের মতে, শহরে মানুষের ভিড় বেশি হওয়ায় এসব খাবারের দোকানে অনেক ক্রেতা আসে। এতে অনেক মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তারা এটাও স্বীকার করেন যে, পার্কের ভেতরে দোকান বসানো ঠিক নয় এবং এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থাকলে ভালো হতো।
শুধু ২নং রেলগেটের এই পার্কই নয়, পুরো নারায়ণগঞ্জ শহরজুড়েই হকারদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর। শহরের প্রধান সড়ক, ফুটপাত ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো এখন অনেকাংশেই হকারদের দখলে চলে গেছে। এতে করে পথচারীদের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে শহরের ১নং রেলগেট, ২নং রেলগেট, চাষাঢ়া, বঙ্গবন্ধু সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হকারদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক পথচারীকেই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারছে না। কয়েকদিন অভিযান চলার পর আবার আগের মতোই ফুটপাত ও জনসাধারণের স্থানগুলো দখল হয়ে যায়।
সচেতন নাগরিকদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা পরিকল্পিত ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে ফুটপাত, রাস্তার পাশে কিংবা পার্কের মতো জনসাধারণের জায়গায় দোকান বসাচ্ছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একদিকে হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে শহরের জনসাধারণের স্থানগুলো রক্ষা করাও জরুরি। এজন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর তদারকি। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট মার্কেট বা নির্ধারিত এলাকা তৈরি করা হলে ফুটপাত ও পার্ক দখলের প্রবণতা কমে আসতে পারে।
এদিকে নগরবাসীর প্রত্যাশা, ২নং রেলগেটের পার্কটি আবার আগের মতো ফিরে আসুক। যেখানে মানুষ নিরিবিলি বসে কিছু সময় কাটাতে পারবে। পাশাপাশি শহরের ফুটপাত ও জনসাধারণের স্থানগুলো দখলমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নগরবাসীর ভাষ্য, পার্ক মানুষের স্বস্তির জায়গা। সেটি যদি দোকানপাটে ভরে যায়, তাহলে শহরের মানুষ কোথায় গিয়ে একটু শান্তিতে বসবে—এই প্রশ্ন এখন অনেকেরই। তাই পার্কটি দখলমুক্ত করে নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।
নাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানায়, আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালাই। আমরা যখন যাই তারা উঠে যায় পরে আবার শুনি তারা বসে পরেছে। তবে আময়া এর স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিবো।