আবু সাউদ মাসুদ
প্রকাশ : Mar 1, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

খানপুর হাসপাতালে সেবার সংকট

সোজাসাপটা রিপোর্ট: নারায়ণগঞ্জের লাখো মানুষের চিকিৎসা সেবার প্রধান ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতাল। সরকারি এই হাসপাতালটি জেলার অন্যতম বড় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেবা নিয়ে নানা অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ সরকারি হাসপাতাল হয়েও এখানে অনেক ক্ষেত্রে সেবার বদলে যেন চলছে বাণিজ্য, মৌলিক চিকিৎসা সামগ্রী না দিয়ে বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হচ্ছে, আর ছোটখাটো সমস্যাতেও রোগীদের রেফার করে পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণ জ্বর, পেটব্যথা, কাটা-ছেঁড়া কিংবা হালকা আঘাতের মতো সমস্যায়ও অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে দ্রুত রেফার করা হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীদের পাঠানো হচ্ছে রাজধানীর বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
ফতুল্লা থেকে আসা এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, আমার ভাইয়ের হাতে সামান্য কাটা ছিল। সেলাই আর ইনজেকশন দিলেই হতো। কিন্তু বলা হলো ঢাকায় নিয়ে যেতে। আমরা অবাক হয়ে গেছি। জেলা শহরের এত বড় হাসপাতালে যদি এই চিকিৎসা না হয়, তাহলে মানুষ কোথায় যাবে?
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, জেলা পর্যায়ের ৩০০ শয্যার হাসপাতালে প্রাথমিক ও মাঝারি জটিলতার চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা থাকা উচিত। অপ্রয়োজনীয় রেফারাল রোগীর পরিবারের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, একই সঙ্গে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ ফেলে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে। কয়েকজন রোগী জানান, কাটা-ছেঁড়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অ্যান্টি টিটেনাস সিরাম (এটিএস) অনেক সময় হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হয় না। রোগীদের বাইরে ফার্মেসি থেকে কিনে আনতে বলা হয়।
এক নারী রোগীর স্বজন বলেন, ডিউটি ডাক্তার এটিএস দিতে বললেন। কিন্তু নার্স জানালেন, স্টকে নেই। বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। সরকারি হাসপাতালে যদি এটিএস না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কিভাবে ভরসা করবে?
সরকারি হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী জরুরি ও মৌলিক ওষুধ মজুদ থাকার কথা। তবে সরবরাহ সংকট, ব্যবস্থাপনার ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো কারণে এসব ওষুধের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে কি না তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
রোগীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সেবা পেতে গেলে অফিসিয়াল খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ থাকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্রুত করতে বা বেড পেতে অনানুষ্ঠানিকভাবে টাকা দাবি করা হয় এমন অভিযোগও রয়েছে।
এক বৃদ্ধ রোগী বলেন, সরকারি হাসপাতাল বলেই এখানে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখি, নানা অজুহাতে টাকা লাগছে। গরিব মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতাল, কিন্তু গরিবরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডাঃ বাশার সবকিছুই অস্বীকার করেন এবং বলেন এমন কিছুর প্রমান পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে রোগীদের অভিজ্ঞতা বলছেসেবার মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে।
হাসপাতাল ঘিরে দালাল চক্রের তৎপরতা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। অভিযোগ আছে, হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশে কিছু ব্যক্তি রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। দ্রুত রিপোর্ট, ভালো ডাক্তার বা উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে তারা রোগীদের প্রভাবিত করে।
একাধিক রোগীর স্বজন জানান, হাসপাতালের ভেতরে দাঁড়িয়েই কিছু লোক এসে বলে এখানে সময় নষ্ট করবেন না, বাইরে নিয়ে চলেন। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অনেকেই বুঝতে পারেন না, কে হাসপাতালের কর্মকর্তা আর কে দালাল।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দালালদের কারণে সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় এ চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন শত শত রোগী খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেবার মান নিশ্চিত করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ওষুধ সরবরাহের স্বচ্ছতা, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন, রেফারাল নীতিমালার সঠিক প্রয়োগ এবং দালালবিরোধী কঠোর অবস্থান এসব নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে সিসিটিভি নজরদারি জোরদার, অভিযোগ বক্স সক্রিয়করণ এবং দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা প্রয়োজন।
রোগীদের দাবি, সরকারি হাসপাতাল যেন প্রকৃত অর্থেই জনগণের হাসপাতাল হিসেবে কাজ করে। মৌলিক চিকিৎসা সামগ্রী মজুদ রাখা, অপ্রয়োজনীয় রেফারাল বন্ধ করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
নারায়ণগঞ্জের মানুষের দীর্ঘদিনের ভরসার এই হাসপাতালকে ঘিরে যে অভিযোগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন না হলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে পরিস্থিতি বদলাতে।
এ বিষয়ে কথা বলতে নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মুশিউর রহমান বলেন, কোন রোগি বা তার স্বজনরা যদি লিখিত অভিযোগ করে আমরা সাথে সাথেই ব্যবস্থা নিবো। এবং আপনাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আমরা তদন্ত করে দ্রুত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এতিমদের সাথে আজাদের ইফতার

1

নাসিকের অংশীজন সভা

2

হাসিনা অটিজম চাইল্ড কেয়ারে অটিস্টিক শিশু-কিশোরদের মাঝে শীত ব

3

খালেদা জিয়াকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা দিচ্ছে লন্ডন ক্লিনিকের মেড

4

চোটের কারণে ছিটকে গেলেন দুই দেশের দুই তারকা

5

হাসান জাহাঙ্গীরকে বিয়ের গুজব, মুখ খুললেন মৌসুমী

6

মদনগঞ্জে বিএনপির মান রক্ষা

7

‘সন্ত্রাস দমনে কাজ করবো’

8

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পোস্ট ভাইরাল

9

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

10

ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে পিতা নিহত

11

আমাদের পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে: টুকু

12

নদের জায়গা দখল, জরিমানা

13

প্রথম জুম্মায় শহরের মসজিদ মসজিদে মুসল্লিদের ঢল

14

অতীতের রাষ্ট্রপরিচালকেরা দুর্নীতি করে আঙুল ফুলে বটগাছ হয়েছেন

15

কালামকে পাশে রেখে দায়িত্ব গ্রহণ

16

ইরানকে ভেঙে ফেলতে চায় ইসরাইল

17

এবার টিপু সুলতানকে ‘খলনায়ক’ বানানোর চেষ্টায় হিন্দুত্ববাদী বি

18

মাঠে তেল চোরা দেলু : ওসমানদের প্রার্থী আবুল কালাম!

19

দূষণে বিপন্ন শীতলক্ষ্যা

20