ঢাকা ১০:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ফতুল্লায় শাহ আলম, কাসেমীর আচরণ বিধি লঙ্ঘন

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৩:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ৩৭ জন পড়েছেন

ফতুল্লায় নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি রীতিমতো এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। বারবার সমালোচনা, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের আচরণে কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আচরণ বিধি ভেঙে ভোট প্রার্থনার ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ফতুল্লা এখন আচরণ বিধি লঙ্ঘনের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে।

শনিবার ( ১৭ জানুয়ারি) ফতুল্লার হরিহর পাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পঞ্চবটি এডভেঞ্চার ল্যান্ডে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই উপস্থিত হন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ শাহ আলম এবং বিএনপি জোটের জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম মনোনীত প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্মরণীয় আয়োজন হওয়ায় সেখানে শিক্ষক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অতিথিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ও সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায় দুই প্রার্থীর প্রকাশ্য ভোট প্রার্থনার কারণে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, তারা দুজনই পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে অতিথিদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখা করেন, হাত মেলান, ছবি তোলেন এবং সরাসরি ভোট চান। কেউ কেউ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলেও অনেক অতিথিই বিরক্তি প্রকাশ করেন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুবর্ণজয়ন্তীর মতো আয়োজনে এমন আচরণ অনুষ্ঠানটির পরিবেশ নষ্ট করেছে বলে মন্তব্য করেন একাধিক অতিথি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখন আর কোনো জায়গা বাকি নেই যেখানে এরা ভোট চাইতে যায় না। স্কুলের অনুষ্ঠান, দোয়া মাহফিল, সামাজিক আয়োজন সবখানেই একই চিত্র। এতে শুধু আচরণ বিধিই লঙ্ঘন হচ্ছে না, বরং এসব অনুষ্ঠানের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আরেকজন সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, সুবর্ণজয়ন্তী মানে স্মৃতি, আবেগ আর গর্বের দিন। সেখানে রাজনৈতিক প্রচারণা ঢুকে পড়ায় আমরা খুবই বিব্রত হয়েছি।

অনুষ্ঠান চলাকালীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই লিখেছেন, আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দিক দিয়ে কাসেমী ও শাহ আলম যেন আলাদা কোনো প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলেন, সারাদেশে যদি আচরণ বিধি ভাঙার কোনো তালিকা করা হয়, তাহলে শীর্ষে থাকবে এই দুই প্রার্থীর নাম। স্থানীয় রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের লাগামহীন আচরণ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় প্রার্থীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। তারা মনে করেন, শুধু বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না, মাঠ পর্যায়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই কেবল এই প্রবণতা কমানো সম্ভব।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলায় আমাদের ১৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন। পাঁচটি আসনে পাঁচজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে কমিশন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে প্রকাশ্য ও বারবার সংঘটিত আচরণ বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় আগাম উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে না। ফতুল্লার মতো এলাকায় একের পর এক ঘটনায় ক্ষোভ জমতে জমতে এখন বিস্ফোরণের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। তাদের আশঙ্কা, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এমন আচরণ আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

ফতুল্লার রাজপথ থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান সর্বত্র যখন আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দৃশ্য চোখে পড়ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা নিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুবর্ণজয়ন্তীর মতো একটি আয়োজনেও যদি রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা না পায়, তাহলে সাধারণ মানুষ আর কোথায় স্বস্তি পাবে, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে ফতুল্লাবাসীর মুখে মুখে।

ট্যাগ :

সংবাদটি সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ফতুল্লায় শাহ আলম, কাসেমীর আচরণ বিধি লঙ্ঘন

আপডেট সময় : ০৮:৪৩:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

ফতুল্লায় নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি রীতিমতো এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। বারবার সমালোচনা, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের আচরণে কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আচরণ বিধি ভেঙে ভোট প্রার্থনার ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ফতুল্লা এখন আচরণ বিধি লঙ্ঘনের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে।

শনিবার ( ১৭ জানুয়ারি) ফতুল্লার হরিহর পাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পঞ্চবটি এডভেঞ্চার ল্যান্ডে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই উপস্থিত হন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ শাহ আলম এবং বিএনপি জোটের জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম মনোনীত প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্মরণীয় আয়োজন হওয়ায় সেখানে শিক্ষক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অতিথিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ও সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায় দুই প্রার্থীর প্রকাশ্য ভোট প্রার্থনার কারণে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, তারা দুজনই পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে অতিথিদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখা করেন, হাত মেলান, ছবি তোলেন এবং সরাসরি ভোট চান। কেউ কেউ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলেও অনেক অতিথিই বিরক্তি প্রকাশ করেন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুবর্ণজয়ন্তীর মতো আয়োজনে এমন আচরণ অনুষ্ঠানটির পরিবেশ নষ্ট করেছে বলে মন্তব্য করেন একাধিক অতিথি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখন আর কোনো জায়গা বাকি নেই যেখানে এরা ভোট চাইতে যায় না। স্কুলের অনুষ্ঠান, দোয়া মাহফিল, সামাজিক আয়োজন সবখানেই একই চিত্র। এতে শুধু আচরণ বিধিই লঙ্ঘন হচ্ছে না, বরং এসব অনুষ্ঠানের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আরেকজন সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, সুবর্ণজয়ন্তী মানে স্মৃতি, আবেগ আর গর্বের দিন। সেখানে রাজনৈতিক প্রচারণা ঢুকে পড়ায় আমরা খুবই বিব্রত হয়েছি।

অনুষ্ঠান চলাকালীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই লিখেছেন, আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দিক দিয়ে কাসেমী ও শাহ আলম যেন আলাদা কোনো প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলেন, সারাদেশে যদি আচরণ বিধি ভাঙার কোনো তালিকা করা হয়, তাহলে শীর্ষে থাকবে এই দুই প্রার্থীর নাম। স্থানীয় রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের লাগামহীন আচরণ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় প্রার্থীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। তারা মনে করেন, শুধু বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না, মাঠ পর্যায়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই কেবল এই প্রবণতা কমানো সম্ভব।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলায় আমাদের ১৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন। পাঁচটি আসনে পাঁচজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে কমিশন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে প্রকাশ্য ও বারবার সংঘটিত আচরণ বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় আগাম উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে না। ফতুল্লার মতো এলাকায় একের পর এক ঘটনায় ক্ষোভ জমতে জমতে এখন বিস্ফোরণের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। তাদের আশঙ্কা, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এমন আচরণ আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

ফতুল্লার রাজপথ থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান সর্বত্র যখন আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দৃশ্য চোখে পড়ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা নিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুবর্ণজয়ন্তীর মতো একটি আয়োজনেও যদি রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা না পায়, তাহলে সাধারণ মানুষ আর কোথায় স্বস্তি পাবে, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে ফতুল্লাবাসীর মুখে মুখে।