স্টাফ রিপোর্টার
দীর্ঘ ১৮ মাস সাংগঠনিক স্থবিরতার পর আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের পরদিন থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে এক ডজনের বেশি জেলা ও উপজেলায় দলীয় কার্যালয় খুলে দোয়া-মোনাজাত, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ব্যানার টানানো ও স্লোগান দিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে এ ধরনের উপস্থিতি কেবল সাংগঠনিক বার্তা নয়; বরং জাতীয় রাজনীতিতে পুনরায় জায়গা করে নেওয়ার কৌশলগত প্রচেষ্টার অংশ। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে গণভোটে বিএনপির তৃণমূলের ‘না’ ক্যাম্পেইন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়া, গণভোট ও জুলাই সনদের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্য ও অবস্থান, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতের উত্থান ঠেকাতে দুই দলের নেতাকর্মীদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন ছাড়াও পটুয়াখালীর দশমিনা, বরগুনার বেতাগী, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ, শরীয়তপুর, বগুড়া, পঞ্চগড়, হবিগঞ্জ, খুলনা, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম, পাবনা, চাপাইনবাবগঞ্জ ও নোয়াখালীসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিত হতে দেখা গেছে। কোথাও তালা ভেঙে প্রবেশ, কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আবার কোথাও ব্যানার টাঙিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব কর্মসূচি ছিল স্বল্পসময়ের এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের এ ধরনের তৎপরতার মুখে স্থানীয় ছাত্রদল বা বিএনপি–সমর্থিত নেতাকর্মীদের বাধা, ভাঙচুর বা পুনরায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। বরং বিএনপির হাইকমান্ডকে নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের প্রশ্নে তুলনামূলক কৌশলী ও নমনীয় অবস্থান নিয়ে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অফিস খোলার চেষ্টা, পতাকা উত্তোলনের বাইরে আরেকটি বিষয় সবার নজরে আসে। দীর্ঘ প্রায় নয় মাস পর জামিন পেয়েছেন বরিশাল সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ।
একই সঙ্গে জামিন দেওয়া হয়েছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বরিশাল মহানগর সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনসহ দুজনকে।
বিষয়টিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতি নতুন সরকারের নমনীয় মনোভাব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে। সরকার গঠনের পর বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, ইসলামী দলগুলোর উত্থান বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলা করতে হলে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক মাঠের বাইরে ঠেলে দেওয়া কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক নাও হতে পারে। ফলে মাঠপর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক সহনশীলতার একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ ও সংস্কার ইস্যুতে দুই দলের অবস্থান প্রায় একই বিন্দুতে এসে ঠেকেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়া ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রশ্ন। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করেছে জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি বিরোধী দল। তাদের অভিযোগ, জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক নয়।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। দলটির নেতাদের অনানুষ্ঠানিক বক্তব্যে শোনা যাচ্ছে, জুলাই সনদ কার্যকর হলে তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। ফলে এই ইস্যুতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে নীরব সমঝোতার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, এমন ধারণা রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হচ্ছে।
নির্বাচনের আগেও গণভোট ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় সক্রিয় ছিল। যদিও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি কোনো অবস্থান নেয়নি, তবু তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালান। সে সময় থেকেই দুই দলের মধ্যে দূরত্ব কিছুটা কমতে শুরু করে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আবার প্রকাশ্যে আসতে শুরু করায় স্থানীয় রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কোথাও তারা সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি পালন করে দ্রুত সরে যাচ্ছেন, কোথাও প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে না পেয়ে ফিরে আসছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ এখন সরাসরি বড় কর্মসূচির বদলে ‘উপস্থিতি জানানোর’ কৌশল নিয়েছে। ছোট ছোট প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। একই সঙ্গে তারা দেখছে, বিএনপির প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর বা সহনশীল হয়। এই প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কৌশল।
অন্যদিকে বিএনপির ভেতরেও এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। একটি অংশ মনে করছে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পরিসরে ফিরতে দিলে ভবিষ্যতে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আবার আরেকটি অংশের যুক্তি, বহুদলীয় গণতন্ত্রে একটি বড় দলকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রাখা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং এতে তৃতীয় শক্তি লাভবান হতে পারে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জনগণ চাইলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তানরাও রাজনীতিতে ফিরতে পারেন।’
এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক মহল কেবল ব্যক্তিগত মন্তব্য হিসেবে দেখছে না; বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরুঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন গণঅভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভি–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছিলেন, ‘আমি সবসময়ই উন্মুক্ত। আমি এমন একজন মানুষ, যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করে; তা যত কঠিনই হোক বা যার সঙ্গেই হোক। এটাই আমার কৌশল; জীবনে সবসময়ই এভাবেই চলেছি।’
বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাধান হবে।’
সবশেষ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে প্রথম কর্মদিবসে আওয়ামী লীগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এটা আমরা রাজনৈতিকভাবে পরে জানাব। এ নিয়ে আমাদের সরকারে আলোচনার পরে আপনাদের জানাব।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং সজীব ওয়াজেদ জয় যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় কার্যকর নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্নটি অনেকাংশে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ এবং বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য সমঝোতা না থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি নীরব সমীকরণের আভাস মিলছে। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে সাংগঠনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও জাতীয় রাজনীতির পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কলামিস্ট এবং শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে দেশকে স্থিতিশীল করা কঠিন। আবার তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দিলে জামায়াত-এনসিপি মেনে নেবে না। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ভোটাররাও এটা মেনে নেবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে।
তাহলে বিএনপি কী করতে পারে, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে তারা আসতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে যদি তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।