স্টারভিউ হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ
- আপডেট সময় : ১২:২৪:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ২৯৪ জন পড়েছেন
নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালানো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান স্টারভিউ হাউজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। সাধারণ গ্রাহক, ভূমি মালিক থেকে শুরু করে সরকারি বিধি ও আদালতের রায়কে উপেক্ষা করার মতো একাধিক অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে ঘিরে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজউক অনুমোদিত নকশা অমান্য করে ভবন নির্মাণ, অন্যের জমি দখল, আদালতের রায় অমান্য, ভুয়া ও জাল কাগজপত্র তৈরি, এমনকি আদালত ও ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরে রাজউক অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করায় গত ২০ এপ্রিল ভ্রাম্যমাণ আদালত স্টারভিউ হাউজিং লিমিটেডকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং নির্মাণকাজ স্থগিতের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের এই নির্দেশের পরও প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়মের মধ্যে আনা যায়নি। বরং তারা আগের মতোই নকশা বহির্ভূত ও বেআইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ভূমি দখল ও নকশা বহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে মোঃ আমান হোসেনের জমি নিয়ে। অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, স্টারভিউ হাউজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ রিপন মোঃ আমান হোসেনের চাচা হারুন অর রশিদের কাছ থেকে জমি কিনলেও, সেই জমির সঙ্গে বাদী আমান হোসেনের অংশ জুড়ে দিয়ে নকশা বহির্ভূতভাবে দেয়াল তুলে দখল করে নেয়। এ ঘটনায় মামলা হলে আদালতের রায় আমান হোসেনের পক্ষে গেলেও স্টারভিউ হাউজিং সেই রায় কার্যত উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর সহকারী কমিশনার ভূমির আদালতে দায়ের হওয়া রিভিউ মোকদ্দমা নং ২৩০/২০২৪ মামলার আদেশে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ উঠে এসেছে। আদালতের আদেশে বলা হয়, বিবাদীপক্ষ সোলেনামার কাগজে ঘষামাজা করে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে নামজারি করিয়েছে। আদালতের বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৮৩ সালের একটি দেওয়ানি মামলার সোলেনামায় নির্ধারিত জমির পরিমাণের সঙ্গে নামজারি মামলায় দাখিলকৃত কাগজপত্রের মধ্যে বিস্তর গরমিল রয়েছে। এতে প্রমাণ হয়, বিবাদীপক্ষ প্রতারণামূলকভাবে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে রেকর্ড সংশোধন করিয়েছে।
আদালতের আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, বিবাদীপক্ষ তঞ্চকতাপূর্ণ কাগজপত্র দাখিল করে তর্কিত নামজারি মামলা অনুমোদন করিয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ অনুযায়ী বিবাদীদের নামে মঞ্জুরীকৃত নামজারি আংশিক সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত দখলকৃত জমি মূল খতিয়ানে পুনর্বহালের আদেশ দেওয়া হয়।
এখানেই শেষ নয়। স্টারভিউ হাউজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ রিপন টাকার ক্ষমতার জোরে আদালতের রায়ের কাগজ, ভূমি অফিসের নথি ও রেজিস্ট্রি দলিল গায়েব করার মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত। আদালতের একটি রায়ে ভূমি অফিসের কাগজে ঘষামাজা করে জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গ্রাহক প্রতারণার অভিযোগও কম নয়। একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও স্টারভিউ হাউজিং ফ্ল্যাট হস্তান্তর করছে না। কমার্শিয়াল স্পেস বুঝিয়ে না দিয়ে সেসব জায়গা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ভাড়া আদায় করছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, গ্রাহকের কমার্শিয়াল স্পেসকে নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে দেখিয়ে সরকারকে কর প্রদান করছে, পরে বাকি টাকা গ্রাহককে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে কাগজে-কলমে সম্পত্তির মালিকানা সুকৌশলে নিজেদের দেখিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০১৩ সালে ভূমি মালিকদের সঙ্গে স্টারভিউ হাউজিং লিমিটেডের করা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত মানা হয়নি বলে ভূমি মালিকদের অভিযোগ। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে একতরফাভাবে নকশা পরিবর্তন, নির্মাণের সময়সীমা অমান্য এবং মালিকদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহল মনে করছে, স্টারভিউ হাউজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি প্রতারণামূলক ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ। প্রশাসনের জরিমানা, আদালতের রায় এবং ভূমি অফিসের নির্দেশের পরও যদি একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ম না মানে, তবে সেটি শুধু আইন অবমাননাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। নচেৎ সাধারণ মানুষ ও ভূমি মালিকদের সর্বস্ব হারানোর এই প্রক্রিয়া আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।























