যে তিন ঘটনায় চিড় ধরেছে আ.লীগ নেতাকর্মীদের মনোবলে
- আপডেট সময় : ০৩:১৭:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ১ জন পড়েছেন
শেখ হাসিনার মামলার রায় এবং ভল্টে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের খোঁজ পাওয়ার ঘটনার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এসব ঘটনায় কিছুটা ‘দমে’ গেছেন।
তারা বলছেন, মাঠপর্যায় থেকে ঝুঁকি নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম করার কারণে তাদের জন্য ক্রমশ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। গ্রেফতার আতঙ্কে তাদের থাকতে হচ্ছে লুকিয়ে। শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ঝুলছে হত্যা ও দুর্নীতির মামলা। ফলে এমন পরিস্থিতির মধ্যে দলীয় প্রধানের বিষয়ে নেতিবাচক খবর তাদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে।
তাদের মতে, উদ্ধার করা স্বর্ণ তার পরিবারের সদস্যদের হলেও এটি আয়কর নথিতে দেখানো হলেও নেতিবাচক আলোচনা কম হতো। ফলে পুরো বিষয়টি নেতাকর্মীদের হতবাক করেছে।
জানা গেছে, এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দলটির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা হতবাক হয়েছেন। কারণ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে ভেতরে ভেতরে এতকিছু ঘটেছে, যা তাদের জানা ছিল না। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের আদৌ এসব সম্পদ অর্জনের প্রয়োজন ছিল কি না-এমন প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ কোনোদিন ফিরে এলেও সম্পদ অর্জনের এসব ঘটনা ইতিহাস হয়ে থাকবে।
অনেকের মতে, এসব ঘটনা নৈতিক দিক থেকেও দলটিকে কিছুটা দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দেবে। বিশেষ করে, শেখ হাসিনার নির্দেশে নানাভাবে তৎপর থাকার অংশটির মধ্যে এসব ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনা নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করতেন। ফলে এ ধরনের অন্যায়-দুর্নীতির খবরে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাদের মতে, দলীয় প্রধানের এ ধরনের কর্মকাণ্ড নেতাকর্মীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দেয়। তাদের মনোভাব দুর্বল করে। অপরাধ স্বীকার করার মানসিকতা সৃষ্টি হলে হয়তো তা দলের রাজনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত।
পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের মনোবলও চাঙা রাখতে সহযোগিতা করত। কিন্তু একের পর এক ঘটনা সামনে আসায় সেই সম্ভাবনা খুব একটা দেখছেন না তারা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মতে, তৎকালীন সরকার এবং সরকারপ্রধান নিজেদেরকে জবাবদিহি থেকে শুরু করে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভেবেছে। যে কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের অধিকার হরণ করে ক্ষমতায় ছিল। আর ক্ষমতায় থেকে তারা চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। যুগান্তরকে তিনি বলেন, সেই চোরতন্ত্রের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এটা সার্বিকভাবে বিব্রতকর। কিন্তু অবাক হওয়ার মতো নয়। অন্তত আমি অবাক নই। কারণ এটা তার ক্ষমতার অপব্যবহারের যে সার্বিক চিত্র, সেটার ক্ষুদ্র একটা অংশ।
তিনি আরও বলেন, তবে সৌভাগ্যের বিষয় যে এগুলো এখন জবাবদিহির মধ্যে আনার একটা ক্ষেত্র বা সুযোগ তৈরি হয়েছে। যার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে প্লট দুর্নীতি মামলার রায়টা হলো। আমার জানা মতে, আরও অন্তত ৫-৬টা মামলায় তার ও পরিবারের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো আছে। যেখানে আয়ের উৎস নেই, কর ফাঁকি আছে। ডকুমেন্টেশন নেই। ফলে প্রতারণা এখানেও চলে আসবে।
শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের ৮৩২ ভরি স্বর্ণের খোঁজ পাওয়ার ঘটনায় দেশের রাজনীতিতেও আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ সভপতি শেখ হাসিনা কথায় কথায় বলতেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। তার কোনো সম্পদ নেই। সম্পদের দরকারও নেই। কিন্তু সেই শেখ হাসিনাই ভল্টে এত স্বর্ণ লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন! আর তাছাড়া স্বর্ণ থাকলে সেটি আয়কর ফাইলে তিনি দেখাননি কেন সে প্রশ্নও উঠছে।
তাছাড়া দুর্নীতি প্রসঙ্গ উঠলেই শেখ হাসিনা কথায় কথায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নামে বিষোদগার করতেন। তাহলে নিজে তিনি কেন সতর্ক থাকলেন না, সেই প্রশ্নও উঠছে। বলা হচ্ছে, তিনি নিজে এবং তার পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের বেশির ভাগই ৫ আগস্টের আগে-পরে নির্বিঘ্নে দেশ ছাড়তে পারলেও বিপদে ফেলে গেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীদের।
সূত্রগুলো জানাচ্ছে, শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে এমনিতেই নেতিবাচক আলোচনা ছিল। এরপর স্বর্ণ ও প্লট দুর্নীতির বিষয়টি সামনে আসায় দলকে আরও বেকায়দায় ফেলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা যুগান্তরকে বলেন, এভাবে আর কতদিন চলবে জানি না। এখনো দলের হাইকমান্ড থেকে কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা নেই। মাঝেমধ্যে ‘খামখেয়ালি দু-চারটি কর্মসূচির’ কারণে উলটো বিপদ বাড়ছে। এর সঙ্গে দলীয় সভাপতির বিরুদ্ধে একের পর এক মামলার রায় এবং নানা নেতিবাচক ঘটনা সামনে আসছে। ফলে এখন দলের হাল কে ধরবে, আর দলই বা কী নিয়ে রাজনীতি করবে তা গভীর চিন্তার বিষয় বলে জানান ওই নেতা।





















